মানসিক চাপ হল একজন ব্যক্তির মানসিক বা শারীরিক অবস্থা যা কাজের চাপ, অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি, দুর্ঘটনা, সংকট, মূল্যবান জিনিসের ক্ষতি বা প্রত্যাশা পূরণের ব্যর্থতা থেকে উদ্ভব হয়। যদিও আমরা সকলেই স্ট্রেস থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করি, তবুও আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক বা পেশাগত জীবনে যেভাবেই হোক এর মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু একজন ব্যাংক কর্মকর্তার মানসিক চাপের ফলাফল হল ক্লান্তি, টেনশন, নার্ভাসনেস এবং হতাশা যার ফলে একজন কর্মকর্তার নিকট হতে তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কাজের ফলাফল/ আউটপুট না পাওয়া।
তবে চাপের ধরন যাই হোক না কেন, আমাদেরকে এ চাপ যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে হবে। অন্যথায় এটি আমাদের স্বাস্থ্যের অবস্থাকে খারাপ করে দিতে পারে। যদি স্ট্রেস বা চাপ দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থায়ী হয় তবে বিষন্নতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিকস, অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন, হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, আলসার, খিঁচুনি, কোষ্ঠকাঠিন্য, ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস, হাঁপানি বা আর্থ্রাইটিসের মতো সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
ব্যাংকের কাজের সাথে সম্পর্কিত ব্যাংকারের মানসিক চাপের কিছু সাধারণ কারণ রয়েছে। যেমন-
দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করাঃ
ব্যাংকের অফিস সময় সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা হলেও খুব কম কর্মকর্তা/ কর্মচারীই ৬টায় অফিস থেকে বের হওয়ার সুযোগ পান। এটি একজন ব্যাংকারের ব্যক্তিগত জীবনে একধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। ব্যাংকে বেশি সময় অবস্থানের কারণে পরিবারের সাথে কম সময় কাটানোর সুযোগ পাওয়া যায়। ফলে পরিবারের সদস্যদের সাথে দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় একধরনের মানসিক চাপ বা অশান্তি সৃষ্টি হয়।
চাকরির নিরাপত্তার অভাবঃ
ব্যাংকের চাকুরির মানসিক চাপের অন্যতম কারন হচ্ছে চাকরির নিরাপত্তার অভাব। ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার কারণে বেসরকারী ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তাই চাকরির নিরাপত্তার হীনতায় ভোগেন। যদি একজন ব্যাংকার তার চাকরি হারায়, চাকরি হারানোর অপমানের কারণে একই মানের অন্য চাকরি খুঁজে পাওয়া তার পক্ষে খুবই কঠিন। ফলে, একজন ব্যাংকার মানসিক চাপ বা অশান্তিতে ভোগে থাকেন।
ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ব্যর্থতাঃ
একজন ব্যাংকারের ব্যাংকিং স্বাভাবিক কাজের বাইরে একমাত্র লক্ষ্য হল ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অর্থাৎ আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ, ঋণ আদায় এবং মুনাফা অর্জন এর নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন। বেশিরভাগ ব্যাংকের কর্মীর কর্মক্ষমতার মানদণ্ড নির্ধারিত হয়ে থাকে এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এর উপর ভিত্তি করে। এমনকি কিছু কিছু ব্যাংকে এসব লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতার কারণে চাকরি হতেও বাদ দেয়া হয়। ব্যবসার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ব্যর্থতাও একজন ব্যাংকারের মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
ঋণ আদায়ের ব্যর্থতা/ খেলাপী ঋণের দায়ঃ
যারা ক্রেডিট বা ঋণ সেকশনে কাজ করেন তারা ব্যাংকের চাকরিতে কিছু অতিরিক্ত চাপ অনুভব করেন। ঋণ বিতরণের পর কোন কারনে ঋণটি খেলাপী হয়ে গেলে বা শ্রেণিকৃত হয়ে গেলে অনেক সময় ঋণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে দায়ী করা হয়। এক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় এ দায়ে একজন কর্মকর্তার পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট বন্ধ করা হয়, অবসর গ্রহণের সুবিধা কর্তন করা হয়।
যথাযথ কাজের পরিবেশ না থাকাঃ
কর্মকর্তা কর্মচারীদের নৈতিকতা হ্রাস, সহকর্মীদের মধ্যে সহযোগিতা হ্রাস এবং প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, বস এবং অধীনস্থদের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক, প্রয়োজনে ছুটির অনুমোদন না পাওয়ার ফলে কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের অবনতি ঘটে। আর এর ফলে অফিসের কাজের পরিবেশ নষ্ট হয় এবং একজন কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী মানসিক চাপ অনুভব করেন।
অত্যধিক কাজের চাপঃ
আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোতে স্বল্পসংখ্যক কর্মী দিয়ে অধিক সংখ্যক কর্মীর কাজ করিয়ে নেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে অধিক কাজের চাপের কারনে কর্মকর্তাদের মাঝে একধরনের মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়। অথচ এ চাপের কারনে একজন কর্মকর্তার নিকট হতে তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কাজের ফলাফল/ আউটপুট পাওয়া যায় না।
বসের চাপঃ
বস এবং অধঃস্তন দুজনই ব্যাংক কর্মকর্তা হওয়া সত্বেও বসের বিভিন্ন ধরনের চাপের কারনে মানসিক চাপ তৈরী হতে পারে। আপনি ব্রাঞ্চের কর্মকর্তা হিসেবে ম্যানেজারের নিকট হতে বিভিন্ন চাপের সম্মুখীন হতে পারেন। বসও কিন্তু হেড অফিসের তার বস থেকে চাপের সন্মুখীন হতে পারেন। আবার হেড অফিসের বস এমডির নিকট হতে, এমডি মালিকপক্ষের নিকট হতে চাপের সন্মুখীন হতে পারেন। যে যার নিকট হতেই চাপের সন্মুখীন হোননা কেন, এ চাপ একজন ব্যাংক কর্মীর মানসিক চাপ তৈরী করে কাজের পরিবেশ নষ্ট করতে পারে।
বৈষম্যঃ
বৈষম্য বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। এটা হতে পারে আর্থিক, পদবীগত এবং সম্মানগত। সমকক্ষ ব্যাংক বা অন্যান্য শিল্পের সাথে কিংবা একই ব্যাংকে কর্মরত অন্য কর্মকর্তাও সাথে বেতন এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা, পদোন্নতি, পদবী, সন্মান ইত্যাদি ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরী হয়ে থাকে এবং এর ফলে কর্মীদের মধ্যে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
যেহেতু ব্যাংকিং একটি সম্পূর্ণ পরিষেবা ভিত্তিক কাজ এবং ভাল পরিষেবা নির্ভর করে কর্মচারীরা ক্লায়েন্টদের সাথে কেমন আচরণ করে তার উপর। কর্মচারীরা চাপে থাকলে, পরিষেবা ব্যাহত হতে পারে যা সরাসরি ব্যাংকের সুনামকে প্রভাবিত করে। কখনও কখনও কর্মীরা মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে ধূমপান, অ্যালকোহল বা মাদকাসক্তি ইত্যাদির মতো কিছু খারাপ অভ্যাসের সাথে জড়িত হতে পারে। তাই, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে মনোযোগ দেয়া জরুরী।
লেখকঃ রিপন আবু হাসনাত, ব্যাংকার
0 মন্তব্যসমূহ