ব্যাংকিং অপারেশনে একজন ব্যাংক কর্মী বিভিন্ন ধরনের ক্য¬ারিক্যাল ভুল করে থাকেন। এ ধরনের ভুলের মধ্যে রয়েছে কোন এন্ট্রি বা কাজ বাদ পড়া, ভুল পোস্টিং ও ভুল মতামত বা সিদ্ধান্ত প্রদান। এ ধরনের ভুলে গ্রাহকসেবা বিলম্বিত হতে পারে, রাগান্বিত ক্লায়েন্ট ব্যাংক ত্যাগ করতে পারে, ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, ব্যাংক বড় ধরনের ক্ষতির সম্মূখীন হতে পারে, এমনকি রেগুলেটরী কর্তৃপক্ষের জরিমানার সম্মুখীন হতে পারে। অথচ ধারণা করা হয় যে- সমস্ত ক্ল্যারিক্যাল ত্রুটি হল মানব সৃষ্ঠ ত্রুটি এবং এ ত্রুটির পিছনে ব্যাংক কর্মীর কাজের প্রতি অনীহা বা অবহেলা জড়িত। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- যখন একটি বিমান দুর্ঘটনা ঘটে তখন ধরে নেয়া হয় যে পাইলটের ভুলেই সে দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু আসলে কি তাই? না। সত্যটা হচ্ছে একটি বিমান দুর্ঘটনা ঘটার পিছনে ইঞ্জিনের ত্রুটি, জ্বালানী শেষ হয়ে যাওয়া, প্রাকৃতিক দূর্যোগের মতো অনেক কারন থাকতে পারে। ঠিক তেমনি ব্যাংক কর্মীও একটি কাজে ভুল করা মানে কাজের প্রতি অবহেলা বা অণীহা নয়, অন্যান্য অনেক কারণ থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার উচিত ভুলের কারণ চিহ্নিত করা এবং তা সমাধানের উপায় খোজে বের করে তা বাস্তবায়ন করা।
এবার আসুন জেনে নেই একজন ব্যাংক কর্মী কেন তাঁর কাজে ভুল করে/ ভুল করার কারণসমূহ কী কী। একজন ব্যাংক কর্মী যেসব কারণে তাঁর কাজে ভুল করে তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-
কাজের অতিরিক্ত চাপ
কাজের অতিরিক্ত চাপ থেকে কাজের মনোবল এবং মনোযোগ নষ্ট হয়ে একজন ব্যাংকারের কাজে ভুল হতে পারে। এমনকি সর্বোত্তম প্রশিক্ষিত কর্মকর্তাও যদি অতিরিক্ত কাজের চাপে থাকেন তাঁর দ্বারা সাধারণ কাজে ভুল হয়ে যাওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। একজন কর্মীর হাতে কী পরিমাণ কাজ রয়েছে এবং তিনি কী পরিমাণ কাজ করতে সক্ষম তা ব্যাংক ব্যবস্থাপনার উচিত। অন্যথায়, অতিরিক্ত কাজের চাপে কাজের মান হ্রাস পাবে এবং কাজে ভুল হবে।
জটিল কাজ
কোন কাজ যদি খুব জটিল হয় এবং সিস্টেমেটিক না হয় তবে একজন ব্যাংক কর্মী তাঁর কাজে ভুল করবেন। এক্ষেত্রে একজন ব্যাংক কর্মীর নিকট হতে খুব বেশি সেবা বা কাজ আশা করা যায় না। এজন্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের উচিত অপ্রয়োজনীয়, অপব্যয় এবং অপ্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলি দুর করে নতুন করে কাজের নকশা প্রনয়ণ করা ও কাজ সম্পাদনের পদ্ধতি সহজ করা।
অস্পষ্ট নির্দেশ বা ণীতিমালা
যদি কোন কাজ অস্পষ্ট থাকে, কাজ সম্পাদনের নির্দেশ অস্পষ্ট থাকে কিংবা কোন নীতিমালা অস্পষ্ট থাকে সেক্ষেত্রে একজন ব্যাংক কর্মীর পক্ষে কাজে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। যে কোন নির্দেশনা অস্পষ্ট থাকলে তার ব্যাখ্যা ভিন্ন ভিন্ন জনের কাছে ভিন্ন ভিন্ন রকম হবে। ফলে একজনের কাছে যা সঠিক তা অন্যজনের কাছে ভুল বলেও বিবেচিত হতে পারে। তাই অপারেটিং ম্যানুয়ালগুলি নিয়মিত আপডেট করা এবং ম্যানুয়াল সহজ ভাষায় লেখা উচিত এবং যেগুলোর ব্যাখ্যা প্রয়োজন সেগুলোর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা উচিত।
যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব
প্রশিক্ষণবিহীন বা অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা/ কর্মচারীদের যদি সহজ কাজও দেওয়া হয়, সেখানেও ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এক্ষেত্রে একজন কর্মকর্তা/ কর্মচারী তার সর্বাত্বক চেষ্টা থাকা সত্বেও তিনি যে তার কাজে ভুল করছেন তা জানতেও পারেন না। ব্যাংকের জটিল, সংবেদনশীল বা ফ্রন্ট-লাইনের কার্যক্রমে নিযুক্ত কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সঠিক লোককে সঠিক জায়গায় পদায়ন করা ব্যাংক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
একঘেয়েমী কাজ
একঘেয়ে কাজের মধ্যে ক্রমাগত বিরক্ত আসে। একঘেয়েমী কাজে একজন কর্মী কাজের একঘেয়েমীতার বিরুদ্ধে লড়াই করার চেষ্টা করে এবং শেষ পর্যন্ত কাজের একাগ্রতা হারায় এবং ভুল করে। একঘেয়ে কাজে সহজাতভাবে কোন ভুল হয় না। কিন্তু একঘেয়েমী কাজ করতে করতে একজন কর্মীর মধ্যে এক ধরনের উপহাসাত্বক, ব্যঙ্গাত্মক বা ছোট/ সহজ কাজ এমন মনোভাব চলে আসে, ফলে অসতর্ক অবস্থায় কাজে ভুল হয়। এজন্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের উচিত কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকে মাঝে মাঝেই তাদেও ডেস্ক/ সেকশন বা ডিপার্টমেন্ট বদল করা উচিত।
দুর্বল কাজের পরিবেশ
প্রতিকূল পরিবেশ বা কাজের পরিস্থিতিতে কর্মরত কোনও কর্মী কাজে ভুল করবেন এটাই স্বাভাবিক। কোলাহল, অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম, কম বা বেশি আলো, অনুপুযুক্ত ট্যাকনিকেল সাপোর্ট কাজের প্রতিকুল পরিবেশ তৈরী করে। এরকম পরিবেশে একজন কর্মী তার হাতের কাজটিতে যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারেন না। ব্যাংক ব্যবস্থাপনা হতে কর্মকর্তা/ কর্মচারীদের জন্য কাজের একটি অনুকূল, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ, আরামদায়ক কাজের ক্ষেত্র তৈরি করা উচিত।
প্রণোদণা ও মুল্যায়নের অভাব
কর্মীদের নিকট হতে সর্বাধিক এবং সর্বোত্তম কাজ বা সেবা পেতে হলে তাদেরকে আর্থিকভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এমন একটি সিস্টেম থাকা উচিত যেখানে অধিক সংখ্যক কার্য সম্পাদন এবং নির্ভূল কার্য সম্পাদনের জন্য তাদেরকে আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি নন আর্থিক সুবিধা বাড়িয়ে দেয়া উচিত। এতে তাদের নির্ভূল কার্য সম্পাদনের আগ্রহ বাড়বে। ফলে কাজের গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে এবং কাজের গতিও বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু অধিকাংশ ব্যাংক কর্মীই কাজ করেও সঠিক মুল্যায়ন না পাওয়ায় কাজের গতি হারান এবং হতাশ হয়ে যান। ফলে কাজের প্রতি কোন উৎসাহ না পেয়ে ইচ্ছে করেই কাজে ভুল করেন।
পরিশেষে বলতে হয়, কতিপয় দুষ্ট ব্যাংক কর্মী ছাড়া কেউ ইচ্ছাকৃত ভুল করতে চান না। প্রায় সকল ব্যাংক কর্মীই নির্ভূল কার্য সম্পাদন করতে চান। তাই যারা কাজ করবেন তাদের মূল্যায়ন করতে হবে। যারা ভবিষ্যতে কাজ এড়ানোর নিমিত্তে বর্তমানে কাজে ফাকি দিতে চান বা যারা ইচ্ছে করে কাজে ভুল করেন তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা উচিত।
লেখকঃ রিপন আবু হাসনাত, ব্যাংকার, বিবিএ (ব্যবস্থাপনা), ঢাবি, এমবিএ (মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা), ঢাবি, ব্যাংকিং ডিপ্লোমা-পার্ট-১ ও ২

0 মন্তব্যসমূহ