প্রথমে ভেবেছিলাম এটি গুজব। আজ দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় পড়ে নিশ্চিত হলাম যে খবরটি শতভাগ সত্য। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশের ৩ টি বেসরকারী বানিজ্যিক ব্যাংক তাদের কর্মীদের বেতন ১৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। ব্যাংক ৩ টি হলো এক্সিম, দ্যা সিটি এবং এবি ব্যাংক। ব্যাংক পরিচালকদের সংগঠিন বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) সকল ব্যাংককে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য চিঠি পাঠিয়ে উৎসাহ দিচ্ছে। বিএবির ঐ চিঠিতে ব্যাংকারদের নানা সুবিধা বন্ধের পাশাপাশি ৪০ হাজার টাকার বেশি বেতনধারীদের ১৫ শতাংশ করে বেতন কমানোর কথা বলা হয়েছে। সব ব্যাংক যাতে আগামী ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে, সেই পরামর্শ দিয়েছে বিএবি। বিএবির চিঠিতে কর্মীদের পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধি, প্রণোদনা বোনাস বন্ধ, নতুন শাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং ও উপশাখা খোলা বন্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। ১৩ দফা সুপারিশ–সংবলিত চিঠিতে আরও রয়েছে সব ধরনের স্থায়ী সম্পদ ও আইটি পণ্য ক্রয় বন্ধ রাখা, কর্মীদের স্থানীয় ও বিদেশি প্রশিক্ষণ বন্ধ রাখা, সব বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ রাখা, সব ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতা খরচ ও অনুদান বন্ধ রাখা, পত্রিকা ও টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন প্রদান বন্ধ রাখা ইত্যাদি।
আমার পরিবারের কেউই ব্যাংকার নন। শ্বশুর ব্যাংকার ছিলেন তবে তিনি এখন রিটায়ার্ড। তাই ব্যক্তিস্বার্থে আমি ব্যাংকারদের পক্ষে বলছিনা। তবে সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং বিবেকের তাড়নায় আমি ব্যাংক মালিকদের এমন সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। দেশের করোনা মোকাবেলার এই ক্রান্তিলগ্নে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি যে চাকুরিজীবী গোষ্ঠী আমাদের জন্য জীবন বাজী রেখে সার্ভিস দিয়ে গেছেন তারা হলেন ব্যাংকার। সবাই যখন সাধারণ ছুটিতে, ব্যাংকাররা তখন অফিসে। তাদেরও নিরাপত্তার ভয় আছে, তাদেরও সন্তান-পরিজন আছে। অথচ আমার-আপনার আর্থিক কর্মকান্ড যেনো ব্যহত না হয় সেই তাগিদে প্রতিটি ব্যাংক লকডাউনেও খোলা রাখা হয়েছে এবং এই ব্যাংকাররা হাসি মুখে যতন করে কাজ করেছেন। অনেক ব্যাংকারই কর্মক্ষেত্রে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন এবং কেউ কেউ মারা গেছেন তবে তাদেরকে জাতীয় হিরো বানাতে পারিনি আমরা। এ আমাদের ব্যর্থতা। আমি এই ভেবে স্বান্তনা নিতাম, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে সকল ব্যাংকারকে জাতি স্বশ্রদ্ধ সালাম জানাবে একদিন, সরকার তাদের পুরস্কৃত করবে, ব্যাংক মালিকরা তাদের বেতন বাড়িয়ে দিবে। বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টোটা। আফসোস। ব্যাংক মালিকরা নিজেদের প্রাপ্যটা এতটুকু কমাননি। ব্যাংক থেকে তারা অনেকেই দিনের পর দিন নামে-বেনামে লোন নিয়ে ফেরত দেননি, মাসের পর মাস নানা বাহানায় আর্থিক সুবিধা নিতে ভুলেননি, বছরের পর বছর লভ্যাংশ নিতে কার্পণ্য করেননি। এখন খরচ কমানোর বেলায় প্রথমেই কর্মীদের বেতন কমাচ্ছেন! আপনারা বলতে পারতেন যে আপনাদের নামে নেওয়া খেলাপী ঋণের টাকা আপনারা দ্রুত পরিশোধ করবেন, বলতে পারতেন ব্যাংক থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়া ১ বছর বন্ধ রাখবেন কিংবা বলতে পারতেন পরিচালকদের মিটিং ফি’স বাবদ যে বিপুল টাকা দেওয়া হয়- তা স্থগিত রাখবেন। এমন বলেননি। এমন করলে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি এমনিতেই পুষিয়ে যেতো। সৎ উদ্দেশ্য থাকলে এমনই হতো। রবিঠাকুরের কবিতাটা মনে পড়ছে ভীষণ- ‘এ জগতে হায় সেই বেশী চায়, আছে যার ভুরি ভুরি; রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি’।
ব্যাংকাররা অনেকেই ভয়ে কথা বলছেননা তবে তাদের নিশ্চুপ কান্না আমাদের শুনতে হবে। সোস্যাল মিডিয়া প্রতিবাদের অনেক বড় হাতিয়ার। আমার সামর্থ্য কম। আমি অন্তত ফেসবুকে প্রতিবাদ করবো এবং আশা করবো সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে বেসরকারী ব্যাংক মালিকরা কর্মীদের বেতন কমানোর এমন অমানবিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হবেন...

0 মন্তব্যসমূহ